এই শীতে খেজুর রসের ‌’ভাপা পিঠা’

    0
    1
    1451196009-jessore-2
    ছবি-সংগৃহীত

    মোহাম্মদ সোহেল রানা : –
    অগ্রহায়ণের শুরু থেকে দরজায় উঁকি দিয়েছে শীতের আগমনী বার্তা। হালকা শীতের চাদরে মুড়ে এরই মধ্যে রসনা বিলাসে তৈরি হতে শুরু করেছে শীতের পিঠা-পুলি। পিঠা-পুলি আমাদের খাদ্য সংস্কৃতির অংশ। তাই সংস্কৃতির পথ ধরেই হরেকরকম পিঠাও তৈরি হয়। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শীত এলে সবার আগে তৈরির ধুম পড়ে ভাপা পিঠার। এছাড়া হরেক রকমের পিঠার মাঝে এ অঞ্চলের ‘রসপিঠা’ সবচেয়ে লোভনীয় ও সুস্বাদু। আর ক’দিন পরই গ্রামের ঘরে ঘরে মিষ্টি গন্ধ ছড়াবে রসপিঠা। আত্মীয় ও অতিথি আপ্যায়ন শুরু হবে পিঠা দিয়ে।
    অগ্রহায়ণের শুরু থেকেই মুলত শুরু হয়ে যায় পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। এ সময়ে কৃষকের ঘরে আসে নতুন ধান। নতুন ধানের মন মাতানো গন্ধে ম-ম করে কৃষকের ঘর। এমনই সময় পাওয়া যায় খেজুরের রস। বাড়ি বাড়ি গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নতুন চালের গুঁড়া আর খেজুরের রস বা গুড় দিয়ে পিঠা তৈরিতে। রসপিঠা হলো বিশেষ ধরনের চিতই, যা খেজুরের রসে ভিজিয়ে রাখা হয়। এ পিঠা টাটকার চেয়ে বাসিটায় বেশি সুস্বাদু। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে এ পিঠার আকর্ষণ বেশি।
    আমাদের সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ পিঠা। এমন কিছু পিঠা আছে যা অনেকের খুবই পরিচিত। অগ্রহায়ণ মাস আসতে না আসতেই শুরু হয়ে যায় পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। বাড়ি বাড়ি গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়বে নতুন চালের গুঁড়া আর খেজুরের রস বা গুড় দিয়ে রসের পিঠা তৈরির কাজে।
    অনেক সময় পিঠা বানাতে খেজুরের রসের সঙ্গে মেশানো হয় দুধ, ীর, নারকেল, মসলা ইত্যাদি। তবে একেক পিঠা তৈরি হয় একেক ধরণের উপাদানে। এখন সচরাচর ভাপা, পাটিসাপটা ও চিতই পিঠা মেলে সবখানে। তবে চিতই পিঠার কথা বললে ভেজানো পিঠার নাম এমনিতেই চলে আসে। ভেজানো পিঠাই হলো রসপিঠা। চিতই পিঠা ভেজাতে হয় গুড়, দুধ আর রসের তৈরি মিশ্রণে। এ পিঠা নরম হলে খেতে ভাল লাগে। সাধারণত সন্ধ্যা বা রাতের দিকে বানানোর প্রচলন রয়েছে এ পিঠা। শীতের সকালে এ পিঠা খেতে অন্যরকম আমেজ সৃষ্টি হয় পরিবারের সবার মাঝে। শহরেও এ পিঠা তৈরি হয় তবে তা খুব সীমিত। শহরে তৈরি রসপিঠার চেয়ে গ্রামে তৈরি পিঠার স্বাদ ও ঘ্রাণ অন্যরকম আলাদা। শীতের পিঠা-পায়েস মানেই খেজুর-রস আর গুড়-পাটালির ব্যবহার। হেমন্তে আমন ধান কাটার পরপরই গ্রামাঞ্চলে শত রকমের পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। পাকান, চন্দ্রপুলি, কুলি, ভাপা আর রসে ভেজানো পিঠার কথা শুনলে আমাদের সবারই শীতকালের কথা মনে পড়ে। চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি কাঁচিপোড়া পিঠা আর খেজুরের গুড় কিংবা খেজুরের রস দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পায়েস ও ীরের স্বাদ তো অমৃতসম।
    খেজুর-রস সংগ্রহ :  বর্ষা শেষে প্রকৃতিতে যখন শীতের আগমনবার্তা স্পষ্ট হতে শুরু করে, খেজুর গাছ কাটা (রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করা) শুরু করেন গাছিরা। গাছের মাথা থেকে ১০/১২ ইঞ্চি নিচে কিছুটা জায়গা ধারালো দা দিয়ে কেটে পরিষ্কার করা হয়। পরিষ্কার করা জায়গার মাঝখানে কৌণিক আকারে দুটি গভীর দাগ কাটা হয়। দাগ দুটির মিলনস্থলে বাঁশের সাত-আট ইঞ্চি লম্বা একটি নল পুঁতে দেওয়া হয়। এই নলের মাথায় একটি মাটির পাত্র গাছের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। গাছের কাটা অংশ দুই-তিন দিন পরপর নতুন করে চেঁছে পুরো শীত মৌসুম গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়। বিকেলে গাছ কেটে মাটির ভাঁড় বা ঠিলে ঝুলিয়ে ভোরে তা গাছ থেকে নামানো হয়। একটি সুস্থ-সবল গাছ থেকে প্রতি রাতে এক ঠিলে রস পাওয়া যায়। প্রথমবার গাছ কাটার পর প্রথম রাতে যে রস পাওয়া যায়, গুণ-মানের দিক থেকে তা সবচেয়ে ভালো। স্থানীয়ভাবে একে ‘জিরেন রস’ বলে। গাছ কাটার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনও ক্রমাগত রস ঝরতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রসের গুণমান নিচে নামতে থাকে। তবে রসের মান কেমন হবে, তা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে গাছির দতা ও নিপুণতার ওপর। sandipanbasumunna_1291165810_1-4109465006_a3b44a5a31
    গুড়-পাটালি তৈরি : সূর্য ওঠার আগে খুব ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে বাড়িতে নিয়ে যান গাছিরা। এরপর একটি বড় চুল্লিতে রস জাল দেওয়া হয়। তিন-চার ঘণ্টা জাল দেওয়ার পর রস শুকিয়ে ঘন হয়ে একপর্যায়ে তা গুড়ে পরিণত হয়। প্রথম দিনের রস থেকে সবচেয়ে ভালো মানের গুড় ও পাটালি পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের রস থেকে তৈরি হয় ঝোলা গুড়। গুড়েরই আরেক রূপ পাটালি। রসের রং সরষে ফুলের মতো হয়ে উঠলে তখন খানিকটা পুরোনো গুড় পাত্রের একপাশে নিয়ে ক্রমাগত ঘষে ঘষে ফের পাত্রের গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে পাত্রের সব গুড়ই দানা বেঁধে পাটালি হয়ে যায়।
    এখন অস্তিত্ব সংকটে খেজুর গাছ : ইটভাটার আগুনের জন্য খেজুর গাছ খুবই উপযোগী। আর সে কারণে ইটভাটা মালিকদের কাছে খেজুর গাছের চাহিদাও বেশি। প্রতি মৌসুমে বিপুল সংখ্যক খেজুর গাছ ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য শুধু ইটভাটাই দায়ী নয়। রস-গুড় উৎপাদন করে মানুষ যদি লাভ করতে না পারে, তাহলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমবেই। তা ছাড়া খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরি খুবই সময়সাপে ও কষ্টকর কাজ। সুনিপুণ দতারও প্রয়োজন হয়। নতুন প্রজন্ম এত কষ্টের কাজ এখন আর করতে চাইছে না। ফলে এখন দ গাছিও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক স্থানে খেজুর গাছ থাকলেও গাছির অভাবে সেগুলো থেকে রস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ এবং তা থেকে গুড়-পাটালি তৈরির প্রক্রিয়াটি আরো আধুনিক ও সহজ করতে পারলে এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here