ডায়াবেটিস ঝুঁকিতে শিশুরা

    0
    8

    জাবিয়া হক। বয়স ৪ বছর ৭ মাস। সারা মুখ জুড়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।

    জাবিয়া ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশু। ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় তার মুখে এগুলো সংক্রমিত হয়েছে বলে জানা যায়। ৩ বছর বয়সে তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। গতকাল রবিবার সকালে নগরীর খুলশী এলাকার চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় জাবিয়াকে। সঙ্গে ছিল ওর
    বাবা মোজাম্মেল হক। আনোয়ারার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। নগরের আগ্রাবাদের বাসিন্দা। মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে জানা যায়, শিশুর মুখে প্রথমে দু একটি বিচির মতো দেখা দিলে তিনি সেরে যাবেন ভেবেছেন। পরে এগুলো বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে আসেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী কেউ-ই ডায়াবেটিস রোগী নন। শুধুমাত্র তার দু ছেলেমেয়েই এই রোগে ভুগছে। ৯ বছর বয়েসী বড় ছেলের ডায়াবেটিস সনাক্ত হয় ৫ বছরে বয়সে। জাবিয়ার ৩ বছর বয়সে হঠাৎ করে শুকিয়ে যাওয়া, পানির পিপাসা ও প্র¯্রাব বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখে বাবা মেয়ের ডায়াবেটিসের বিষয়টি নিশ্চিত হন এবং চিকিৎসা শুরু করেন। এক্ষেত্রে ছেলের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান।
    Diabetic-Baby-712x525জাবিয়ার মতো আরো অনেক শিশুই এখন ডায়াবেটিস আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে ক্রমেই শিশুদের মধ্যে এ রোগ বিস্তারের প্রধান কারণ হিসেবে চিকিৎসকেরা পুষ্টিহীনতাকে চিহ্নিত করেন। এছাড়া সুষম ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের ঘাটতিকেও দায়ী করছেন।
    চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমান ‘শূণ্য’ থেকে ১৮ বছর বয়েসী প্রায় ৩০০ ডায়াবেটিস শিশু নিয়মিত এখানে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। এছাড়াও প্রতিদিনই চিকিৎসার জন্য আসছে ডায়াবেটিস আক্রান্ত নতুন নতুন শিশু । এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা শিশুরা চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা, ফেনী, নোয়াখালী, মিরসরাই, সীতাকু-, কক্সবাজার, টেকনাফ, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান প্রভৃতি এলাকার বাসিন্দা। কারণ এই হাসপাতালে রয়েছে সঠিক রোগ নিরূপন ব্যবস্থা ও ডায়াবেটিসের পুর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। রয়েছে ১০ শয্যার একটি শিশু ওয়ার্ড। তাছাড়া ডায়াবেটিস আক্রান্ত গরিব শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও উপকরণ সরবরাহ করা হয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর চৌধুরী দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা গরিব শিশুদের হাসপাতালে আসা-যাওয়ার ভাড়া দিয়ে থাকি। এছাড়া ইনসুলিন এবং টেস্ট মেশিন ‘গ্লুকোমিটার’ ফ্রি দেয়া হয়।’
    কেন হয় শিশুদের ডায়াবেটিস : চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। শরীরে ইনসুলিন নামের হরমোনের সম্পূর্ণ বা আংশিক ঘাটতির কারণে বিপাকজনিত গোলোযোগ সৃষ্টি হয়ে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং এক সময়ে তা প্র¯্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এই সামগ্রিক অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলে। এই রোগে গ্লুকোজের পরিমাণ দীর্ঘস্থায়ীভাবে বেড়ে যায়।
    আমাদের দেশে শিশুর জন্মগত অপুষ্টির জন্য বেশিরভাগ শিশু ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়া শিশুর অতিরিক্ত ওজনের কারণেও এ রোগ দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাশেদা বেগম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ডাক্তারি ভাষায় ডায়াবেটিস হচ্ছে, অটো ইমিউন ডিজিস। কোনো কারণ ছাড়াই ব্লাড সুগার বেড়ে যায়। ইনসুৃলিন ঘাটতি থাকে।
    এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরো জানান, দেড় মাস বয়স থেকে ১০ বছর বয়েসী শিশুরা বেশি ডায়াবেটিস আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এছাড়া আমাদের এখানে বেশিরভাগ নি¤œবিত্ত পরিবারের সন্তান অপুষ্টিজনিত কারণে ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়। শিশুর জন্মের সময়ে মা এবং সন্তানের অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস ঝুঁকি দেখা দেয়। দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় মায়ের সঠিক খাদ্যাভাস বজায় রাখতে না পারায় অগ্নাশয় তৈরি হয়নি। ইনসুলিন বের হয়ে গেছে। আবার জন্মের পরেও শিশুর অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে। এছাড়া হরমোনজনিত বিভিন্ন রোগের কারণে যেমন: ঘন ঘন ইনফেকশন হলে, বিভিন্ন ভাইরাসের কারণে জ্বর হতে থাকলে, জন্মগত সিনড্রম, ডাউন সিনড্রম থ্যালাসেমিয়া, পুশিং সিনড্রমের কারণেও ডায়বেটিস দেখা দেয়।
    ডায়াবেটিসের লক্ষণ : শিশুদের ডায়াবেটিসের লক্ষণ সম্পর্কে ডা. রাশেদা বেগম বলেন, বেশি বেশি খিদে পাওয়া, বেশি প্র¯্রাব, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ বড়দের চেয়েও শিশুদের বেলায় দু’তিন সপ্তাহের মধ্যে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
    চিকিৎসা এবং কুসংষ্কার : অভিজ্ঞতার আলোকে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুদের ডায়াবেটিস হলে অনেক অভিভাবক একে ভিন্নভাবে দেখেন। তারা কুসংষ্কারের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন্ অপচিকিৎসা গ্রহণ করেন। এতে রোগীর ক্ষতি ছাড়া ভালো হয় না। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন নিতে হবে। এর বিকল্প কোনো পদ্ধতি এখনো উদ্ভাবন হয়নি।
    ডা. রাশেদা বেগম জানান, ডায়াবেটিস হাসপাতালে রোগীর পরিবার পরিজনের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতাবোধ জাগাতে সিডিসিপি (চেইঞ্জিং ডায়াবেটিস ইন চিলড্রেন প্রোগ্রাম) নামে একটি কার্যক্রম চালু রয়েছে। এখানে ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুর সঠিক চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
    শিশু ডায়াবেটিস প্রতিরোধে পুষ্টিবিদের পরামর্শ : সিডিসিপি কার্যক্রমের আওতায় ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালে রোগী ও পরিবার পরিজনকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার লিপি। শিশুদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধে তিনি বাবা-মাকে বেশ কিছু বিষয়ে যতœবান হতে অনুরোধ জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি প্রতিটি শিশুর বয়সের সঙ্গে উচ্চতা, ওজন ঠিক রাখা যায়, খাদ্যব্যবস্থা সুষম করা যায় এবং শারীরিক শ্রম বাড়ানো যায় তবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যাবে।
    শিশুর খাবার
    ০ শিশুদের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ দিতে হবে। কোনো অবস্থায় কৌটার দুধ দেয়া যাবে না।
    ০ ছয় মাস থেকে ঘরে তৈরি সহজপাচ্য সুষম খাবার দিতে হবে। দু বছর পর্যন্ত এ ধরনের খাবার চলবে। যেমন: চাল-ডাল, সবজি, মাছ, মুরগির মাংসসহ তেলমিশ্রিত খাবার। তবে খিচুড়িতে কোনোভাবেই কোনো মসলা এবং লবণ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ শিশুর কিডনি লবণ ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
    ০ শিশুকে দিনে ১টা করে ফল দিতে হবে। চাপা বা বাংলা কলা, রসালো ফল, জাম্বুরা, আনারস প্রভৃতি।
    স্কুলগামী বাচ্চাদের খাবার
    ০ কোনো স্কুলগামী শিশু যেন খালি পেটে স্কুলে না যায়। তাকে খাবার নরম করে খাওয়াতে হবে।
    ০ জাঙ্ক ফুড খাওয়ানো যাবে না।
    ০ টিফিন হতে হবে ঘরে তৈরি। এসব খাবারে টেস্টিং সল্ট, বেকিং পাউডার, ইস্ট ব্যবহার করা যাবে না। এগুলো কোনোভাবেই শিশুর উপযোগী নয়। বরং শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
    ০ পানীয় হিসেবে বিভিন্ন ফলের বোতলজাত জুসের পরিবর্তে সরাসরি কচি ডাবের পানি, লেবুর শরবত, বাঙ্গি ইত্যাদি পান করানো যেতে পারে।
    ০ প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করানো উচিত।
    ০ শিশুর মস্তিষ্ক, হাঁড়ের গঠন, অতিরিক্ত বর্ধনের জন্য দরকার প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার। এজন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ, মাংস, কলা, ডিম, দুধ ইত্যাদি খাদ্য উপাদান রাখতে হবে।
    দুধ একটি আদর্শ খাবার। কিন্তু কারো আর্থিক সচ্ছলতার কারণে দুধ পান করা সম্ভব না হলে ২৫০ এমএল দুধের পরিবর্তে ৫০ মি. গ্রা. চীনাবাদাম খাওয়ানো যেতে পারে। এতে একই পুষ্টিগুণ পাওয়া যাবে।
    ০ প্রতিটি শিশুকে শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। এজন্য প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ২০ মিনিট সাইকেল চালানো অথবা এ ধরনের শারীরিক শ্রমযুক্ত যে কোনো খেলাধুলা করতে হবে। ঘরে বসে কম্পিউটারে গেম খেললে চলবে না।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here