ঘুমাতে দাও শ্রান্ত কবিরে জাগায়োনা জাগায়োনা : জাতীয় কবির আজ ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী

    0
    11

    আজ ১২ ভাদ্র জাতীয় কবির ৪০ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এ দিনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরতরে অন্য ভুবনে পাড়ি জমান। আর নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী চিরশয়ানে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গনে। তবে নিজেকে ভুলতে দেননি তিনি। লিখেছেন ও গেয়েছেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব/ তবুও আমারে দেব না ভুলিতে…’। কবি, সাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষ নজরুলের মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন, নজরুলের কথা আজ যখনই মনে পড়ে আমাদের, মনে পড়ে মিলনগত এই অসম্পূর্ণতার কথা। আর তখন মনে হয়, বাকশক্তিহারা তাঁর অচেতন জীবনযাপন যেন আমাদের এই স্তম্ভিত ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতীকচিহ্ন। যে সময়ে থেমে গেলো তার গান, তাঁর কথা, তাঁর অল্পকিছু আগেই তিনি গেয়েছিলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়োনা জাগায়োনা’। রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে নজরুলের এই কথাগুলো আজ তাকেই ফিরিয়ে দিয়ে আমরা বলতে পারি- ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত কবিরে, জাগায়োনা জাগায়োনা’। জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও বিভিন্ন

    বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দিবসের প্রথম প্রহর থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার শুরু করেছে। নগরীতেও নেয়া হয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি।
    বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ, মানবতা ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার লেখনীর মাধ্যমে সকল রকম অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার আর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তার অনন্য সৃষ্টিতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেননি। কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সামনে চলার অন্তহীন প্রেরণার উৎস। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার কবিতা ও গান যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা ও এদেশের মুক্তিকামী মানুষকে সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, উজ্জীবিত করেছে। আজো আন্দোলন সংগ্রামে তার কবিতা ও গান আমাদেরকে শক্তি ও সাহস জোগায়।
    মানব প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মানুষকে ভালোবেসে তাদের কল্যাণে আত্মনিবেদিত হতে তার রচনা আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। তার সাহিত্যকর্ম চিরকাল স্বদেশ প্রেমে অনুপ্রাণিত করবে। কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেছিলেন। একই সঙ্গে বাঙালির মুক্তির গানও ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কণ্ঠে যা তাঁকে আমাদের মাঝে চিরদিন স্মরণীয় করে রাখবে।
    বাংলা সাহিত্যের বিস্ময় প্রতিভা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই বৈচিত্রময় পুরুষই বাংলা সাহিত্যে দৃঢ়তা ও শক্তিময়তার যে অভাব ছিল সেই শূন্যতা তাঁর সৃষ্টি দ্বারা তিনি অবলীলায় পূরণ করেছেন। মহান এই কবি বাংলাদেশের মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট ৭৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মাত্র বাইশ বছর (১৯১৯-১৯৪১ তিনি সাহিত্য সৃষ্টির সময় পেয়েছেন।
    ৪২ বছর বয়সে ১৯৪১ সালে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর জীবন্মৃত অবস্থায় কাটান। সব মিলে তাঁর দীর্ঘ অথচ স্বল্প জীবনকাল-জন্ম, মৃত্যু, নির্বাক-সচেতন রোগাক্রান্তকাল, সাহিত্য সৃষ্টি, সংগীত সৃষ্টি, সৈনিক জীবন, কবিতার জন্য কারাজীবন, অন্য ধর্মের নারীর সঙ্গে বিয়ে, সন্তানের অকাল মৃত্যু, বাঁধনহারা ছন্নছাড়া অনিশ্চিত জীবন-যাপন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক, সমাজতন্ত্র, বৈষ্ণব প্রভাব, ইসলামী সংগীতের সঙ্গে কৃষ্ণ-কালী-চৈতন্য দেব বর্ণনা, আরবী-ফারসি শব্দের ব্যবহার, উদার অসাম্প্রদায়িক মন-মানসিকতা ইত্যাদি সমাহারে বর্ণাঢ্য, দুঃসাহসী, আশ্চর্য ও রহস্যপূর্ণ কবির জীবন। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কবি নজরুল পেয়েছেন প্রতিষ্ঠা। রবীন্দ্রযুগে রবি’র কিরণে তাঁর আলো ম্লান হয়নি। নজরুল নিজ প্রতিভায় ছিলেন উদ্ভাসিত। রবীন্দ্রনাথের স্নেহেও ছিলেন তিনি ধন্য।
    স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ধানম-িতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন তিনি। আর এদেশেই ইহলীলা শেষ হয় তাঁর। নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি চিরশয়ানে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গনে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here