রেললাইনে বসে এক টাকায় দুপুরের খাবার খেল সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা

    0
    19

    রাউজানটাইমস ২৪ ডেস্ক :-

    বেলা তখন আড়াইটা। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুগুলো একে একে আসতে শুরু করেছে রেলপথের ধারে। ৩০মিনিটের মধ্যে জড়ো হয় শ’দুয়েক শিশু। তারা সমাজের একেবারে সুবিধাবঞ্চিত। মৌলিক ৫টি চাহিদা বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা কোনোটি তাদের ভাগ্যে নেই। বেড়ে ওঠছে পথের ধারে ফুটপাতে। এক বেলা খেতে পারলে, আরেক বেলা পায় না। জীর্ণশীর্ণ শরীর। গায়ে নেই ভাল কাপড়। শিক্ষা তাদের কাছে সূদুর পরাহত। চিকিৎসা তো আকাশের চাঁদ। মূলত দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে এ শিশুরা এখানে জমায়েত হয়েছে। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর এসব শিশুদের জন্য বিকেল ৩টার দিকে একটি ভ্যানে করে আসে দুপুরের খাবার। মুহূর্তের মধ্যে রেললাইনের পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে যায় শিশুরা। ভ্যান থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা প্লাস্টিকের বক্সে ভরা দুপুরের খাবার শিশুদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন। প্রতি বক্স খাবারের বিনিময়ে প্রত্যেক শিশু থেকে মাত্র এক টাকা করে নেওয়া হল। খাবার ward-7-pic-782x525সংগ্রহ করে শিশুরা রেললাইনে বসে আহার করতে থাকে। এটি একদিনের চিত্র নয়, রুটিনমাফিক চলে প্রতিদিন। নগরীর ষোলশহরে চলতি বছরের ১৫ মে থেকে শিশুদের জন্য ‘এক টাকার আহার’ চালু করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।
    এই ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক আশরাফুল হক মামুন চৌধুরী, সৌরভ দেবনাথ, রাহিমা আলম তানু ও সানজিদা জাহান দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘এক টাকার আহার’ প্রকল্পটি চালু করে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনটি চালু হয় ২০১৪ সালে। বাংলাদেশি পেরু প্রবাসী প্রকৌশলী কিশোর কুমার দাশ নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবদি গ্রামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটির যাত্রা শুরু হয় ওপেন লাইব্রেরি দিয়ে। এরপর শিশুদের জন্য সহশিক্ষা ও ‘এক টাকার আহার’ প্রকল্পটি চালু করা হয়। নারায়ণগঞ্জে প্রথম চালু হওয়ার দুই বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের ফরেস্টগেট এলাকাও এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চালু করা হয় ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায়। চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকা, কক্সবাজারের রামু ও ফরিদপুরের রাজবাড়িতে এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চালু হয়েছে। এ ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ৫টি মৌলিক চাহিদা পূরণ করা।
    স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, ষোলশহরে প্রতিদিন দুপুরে কমপক্ষে ২০০ শিশুকে খাবার দেওয়া হয়। রাতে দেওয়া হয় ১০০ শিশুকে। তবে কোনো বিশেষ উপলক্ষ থাকলে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার থেকে ১২০০। নগরীর মুরাদপুর, কাজীর দেউড়ি, সিআরবি, আগ্রাবাদ, প্রবর্তক মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার শিশুদের মাঝে এই খাবার বিতরণ করা হয়। খাবারের মেন্যুতে ভাতসহ একেক দিন একেক খাবার বিতরণ করা হয়। মুরগী, ডিম, সবজি, পোলাও, মাছ ইত্যাদি দেওয়া হয়। এছাড়া খাবারের পর কোন কোন দিন মিষ্টান্ন, ফলমূল এবং দুধও দেয়া হয়।
    স্বেচ্ছাসেবকরা আরো জানান, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী কিশোর কুমার দাশ এর শৈশব ভাল কাটেনি। অত্যন্ত অর্থ কষ্টে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে। কোনোদিন খেয়েছে, কোনোদিন অনাহারে কেটেছে। মন্দিরে খাবারের জন্য গেলে লাইন ধরে খাবার নিতে হতো। এমন দিনও গেছে লাইন ধরে এগুনোর পর খাবার শেষ হয়ে গেছে। এজন্য না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। তাই তিনি সংকল্প করেছিলেন, বড় হয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসলে তিনি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু একটা করবেন। তিনি চট্টগ্রামের চুয়েটে লেখাপড়া করেছেন। বর্তমানে পেরুতে গুগলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গুগল ক্লাউডওয়্যারের কমার্শিয়াল ডাইরেক্টর।
    স্বেচ্ছাসেবক আশরাফুল হক মামুন চৌধুরী বলেন, ‘এক টাকার আহার’ প্রকল্পটি প্রকৌশলী কিশোর কুমার দাশ চালু করলেও এখন সমাজের অনেকে এই কাজে এগিয়ে এসেছেন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ফেসবুকের মাধ্যমে সাহায্য করছেন তারা। কেউ টাকা দিয়ে আবার কেউ এসে বাজার করে দিয়ে নিজেরা তত্ত্বাবধান করে শিশুদের মাঝে খাবার দিয়ে থাকেন।
    স্বেচ্ছাসেবক সৌরভ দেবনাথ আরো বলেন, ‘শিশুদের কাছ থেকে খাবারের বিনিময়ে আমরা কেন এক টাকা নিয়ে থাকি তারও একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। আমরা যারা খাবার দিয়ে থাকি তাদের মনে যাতে ভিক্ষা দিচ্ছি এমন ধারণা না আসে। আর শিশুরা যাতে মনে করে ভিক্ষা নয়, কিনে খাচ্ছি।’
    বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের যারা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন, তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে। বিনিময়ে কোন অর্থ নেন না। বর্তমানে এই সংগঠনের ৪৮ জন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। নিবন্ধিত হওয়ার নিয়ম হচ্ছে প্রথম তিন মাস কাজ করার পর তিনি নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ পান। নিবন্ধিত সব স্বেচ্ছাসেবক উচ্চ শিক্ষিত। শিডিউল অনুযায়ী তারা কাজ করে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনকারী সৌরভ দেবনাথ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এবিবিএস ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র, আশরাফুল হক মামুন চৌধুরী আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ফার্মাসি থেকে অনার্স, সানজিদা জাহান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স এবং রাহিমা আলম তানু চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সম্পন্ন করেছেন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here