রাউজানে অন্ধকাররুমে শেকলবন্দী মা

    0
    40

    জাহেদুল আলম । রাউজানটাইমস ২৪.কম

    পুরো রুমটি অন্ধকার। বিদঘুটে গন্ধ পুরো রুমজুড়ে। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দরজা। ভেতরে ৬৫ বছর বয়সী মীরা দে’র পায়ে শেকলপড়া। খাটের (চৌকির) সাথে বাঁধানো সেই শেকল। বাইরে কোন আগুন্তুকের কন্ঠ শুনলেই বৃদ্ধ মীরা বলছে ‘ইবা কন, কন আইস্যিাদে, কিল্লা আইস্যিাদে’ (সে কে, কি জন্যে আসছে) কিংবা অ্যাই ভাত খাইয়ুম, অ্যারে দু’য়া ভাত দে’ (আমি ভাত খাবো, আমাকে অল্প ভাত দাও)।
    রাউজান পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কিশোরী মোহন বাড়ীর এই অসুস্থ মা (মীরা দে’কে) তিনমাসের বেশিসময় ধরে পায়ে শেকল পরিয়ে অন্ধকারঘরে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন তার সন্তানরা। প্রায় দেড়-দুইবছর ধরে এই বৃদ্ধা মানসিক সমস্যা ভূগছেন। তিনমাস ধরে মীরাকে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যাপারটি প্রতিবেশী সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে ােভের সঞ্চার হয়েছে।
    raozan-pic-sekol-1তারা বলছেন, মীরার মানসিক সমস্যা আছে। কিন্তু পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা পাগল নয়। তিনি প্রতিবেশী ও স্বজনদের চিনতে পারেন। ভাত খেতে চান, শেকল খুলে দিতে বলেন। ডাক্তারের কাছে যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে ‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেন। এরকম মহিলাকে চট্টগ্রাম কলেজ হাসপাতাল বা অন্যকোন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করা হলে সুস্থ হয়ে উঠবেন। অথচ তার সন্তানরা সেটি না করে তাকে পায়ে শেকল পরিয়ে বন্দী অবস্থায় রেখেছেন ঘরের মধ্যে।
    প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনসাধারনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বৃদ্ধা মীরা দে’র স্বামী বিরেন্দ্র দে মারা যান বহুবছর আগে। তার দুই ছেলে সন্তানের মধ্যে অঞ্জন দে’র দোকান আছে রাউজানে। কাঞ্চন দে চট্টগ্রাম শহরে থাকেন কর্মসূত্রে। মীরার মেয়ে সন্তানের বিয়ে হয়ে গেছে। দেড়বছর আগে মীরার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। অস্বাভাবিক আচারণের কারনে তাকে কখনো শেকল পরিয়ে রাখা হয়নি। কিন্তু গত তিনমাস ধরে তাকে দুর্গন্ধময় একটি শেকল পরিয়ে তালাবদ্ধ রেখেছেন তার সন্তানরা। এ বিষয়টিকে অমানবিক বলে মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল।
    প্রতিবেশী এক প্রতিবাদী তরুন বলেন ‘মীরার মানসিক কিছু সমস্যা থাকলেও তিনি সবকিছু চিনেন, আমি ডাক দিলে আমার ডাকে সারা দেন, খেতে চান, শেকলপড়া থেকে মুক্ত হয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চান। চিকিৎসা পেলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।’ এই প্রতিবাদী তরুনের মা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন ‘আমি বাইরে থেকে এসেছি বুঝলে আমাকে ভাত দিতে বলেন। সাধ্যমত চেষ্টা করি তাকে খাবার দিতে। তার ছেলেরা তাকে মেডিকেলে না নিয়ে গিয়ে কেন শেকল পরিয়ে রেখেছেন বুঝছিনা, সবসময় শেকল খুলে দিতে বলেন মীরা। খারাপ লাগে তার জন্যে।’ এব্যাপারে প্রতিবেশী রতœা চৌধুরী ও কমলা চৌধুরী বলেন ‘শেকল পড়া থেকে মুক্ত হতে আর্তনাৎ করেন বৃদ্ধা মীরা।’
    raozan-pic-sekol-2এব্যাপারে মীরার ছেলে অঞ্জন দে’র স্ত্রী শিবু দে বলেন ‘দেড় বছরেরও অধিক সময়ধরে শ্বাশুড়ি অসুস্থ। ঔষধ খেতে চায়না। ঝোঁপ জঙ্গলে চলে যায়। তাই তাকে গত তিনমাস ধরে শেকল পরিয়ে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। সেই ঘরেই তাকে খাবার দেয়া হয়। তিনি প্রকৃতির ডাকে সারা দেনও সে ঘরে।’
    এব্যাপারে মীরার ছেলে কাঞ্চন দে’র কাছে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘মানসিক সমস্যার কারনে তাকে (মাকে) কিছুদিন ধরে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। তার চিকিৎসা করাবো।’
    এব্যাপারে স্থানীয় পৌরসভার কাউন্সিলর এডভোকেট দীলিপ চৌধুরী বলেন ‘মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ায় ঘরের মধ্যে এক মহিলাকে আটকে রাখার কথা শুনেছি। বিষয়টি আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখবো।’ এদিকে এ প্রতিনিধি সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে মীরার ছবি তোলার সময় তিনি মুখ ঢেকে রাখেন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here