রাঙামাটিতে লাশের সারি : ৯৮ নিহত

    0
    1

    একটানা বর্ষণের ফলে রাঙামাটিতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। একটানা টানা ভারি বর্ষণে রাঙামাটি জেলায় ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনায় সড়ক ও বসতবাড়ির উপর মাটিচাপা পড়ে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৬ সেনা সদস্যসহ ৯৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছে বেশ কয়েকজন। আহত হয়েছে শতাধিক। গতকাল মঙ্গলবার রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ও মাটিধসে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া হাজার একর জলেভাসা জমির ফসল ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ফলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাঙামাটি গতকাল মঙ্গলবার সংবাদপত্রের গাড়ি আসতে পারেনি। পাশাপাশি রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
    রাঙামাটি সেনা রিজিয়ন সূত্র জানায়- রাঙামাটির মানিকছড়ি এলাকায় একটি পাহাড় ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা চালানের সময় তাদের ওপর পাহাড় ধসে পড়লে ১১ সেনা সদস্য মাটিচাপা পড়েন। এদের মধ্যে ২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৬ জন নিহত হয়। আহত হয় আরো ৫ জন।
    প্রশাসন, হাসপাতাল, স্থানীয় ও উদ্ধার অভিযান সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোর থেকে শহর জেলার বিভিন্ন স্থানে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে থাকে। খবর পেয়ে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় লোকজন সকাল থেকে ঘটনাস্থল গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। দুপুর পর্যন্ত রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ১৪ জনের মরদেহ নেয়া হয় এবং বিকালে আরো দুই জনের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। এছাড়া জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপায় ২ জনের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেন, সিভিল সার্জন ডা. সহীদ তালুকদার।
    এছাড়া কাপ্তাইয়ের রাইখালীর কারিগর পাড়ায় ৪ জন এবং কাউখালী উপজেলা সর্বশেষ ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে স্থানীয় সূত্র। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ভেদভেদীর যুব উন্নয়ন অফিস এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার তৎপরতা চলে। নিহতদের মধ্যে দুই কর্মকর্তাসহ সেনাবাহিনীর ৬ সদস্য রয়েছেন।
    হাসপাতাল ও স্থানীয় একাধিক নির্ভযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, প্রবল বর্ষণে বাড়িঘরে পাহাড়ের মাটি চাপায় শহরসহ রাঙামাটির প্রায় সব এলাকা ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাহাড় ধ্বসের দুর্যোগে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভবাজার, ভেদভেদী, শিমুলতলী, মোনঘর, রাঙামাটি ও মানিকছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ২২ জন, কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায়, ঘাগড়া, ঘিলাছড়ি, কাশখালীসহ বিভিন্ন স্থানে ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন স্থানীয়রা। এছাড়া অনেককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
    এদিকে মানিকছড়িতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি অপসারণের সময় ৬ সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়। তারা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর আহমেদ, সিপাহী আজিজ, শাহীন, ল্যান্স কর্পোরেল আজিজ, সিপাহী মামুন। এছাড়া আরও বেশ কয়েক জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাঙামাটি চট্টগ্রাম, ঢাকায় ভর্তি করা হয়েছে। সকাল ১১টার দিকে হতাহত সেনা সদস্যরা মানিকছড়িতে রাস্তার ওপর ধ্বসে পড়া মাটি অপসারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। ওই সময় আকস্মিক পাশের একটি উচু পাহাড় ধ্বসে পড়ে মাটি চাপা পড়েন তারা।
    দুপুরে যাদের মরদেহ রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তারা হলেন, রুমা আক্তার (২৫), নুর আক্তার (৩), হাজেরা (৪০), সোনালি চাকমা (৩০), অমিয় কান্তি চাকমা (৮), আইয়ুশ মল্লিক (২), চুমকি মল্লিক (২), সুস্মিতা চাকমা (৫), রূপালী চাকমা (৩২), লিটন মল্লিক (২৮), অজ্ঞাত (২২), মিন্টু ত্রিপুরা (৪৫), আবদুল আজিজ (৫৫), অজ্ঞাত (৩২), মিলি চাকমা (৫৫), ফেন্সি চাকমা (৪) এবং কাউখালীর যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন-ফাতেমা বেগম (৬০), মনির হোসেন (২৫), মো. ইসহাক (৩০), দবির হোসেন (৮৪), খোদেজা বেগম (৬৫), অজিদা খাতুন (৬৫), মংকাচিং মারমা (৫২), আশেমা মারমা (৩৭), শ্যামা মারমা (১২), ক্যাচাচিং মারমা (৭), কুলসুমা বেগম (৬০), বৈশাখী চাকমা (১০), লায়লা বেগম (২৮)। বিকালে উপজেলার কয়েক জায়গা হতে আরও ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে নাইপুর মারমা (৪০), সুবাস চাকমা (৪০) নাছিমা বেগমের (৬০) নাম পাওয়া গেছে। ৫ জনের নাম পাওয়া যায়নি। কাপ্তাই রাইখালীর কারিগর পাড়ায় নিহত ৪ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাৎক্ষণিক নাম পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিভিল সার্জন ডা. সহীদ তালুকদার বিলাইছড়িতে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করলেও তাৎক্ষণিক তাদের নাম জানাতে পারেননি।
    ভেদভেদী যুব উন্নয়ন এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি খুড়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হরেও জুই চাকমা (১২) ও জুমজুমী চাকমা (৩) নামের দুই শিশু কন্যাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আগের দিন সোমবার রাঙ্গামাটি শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় এক শিশু এবং কাপ্তাইয়ের নতুন বাজারে এক শিশু পাহাড়ের মাটি চাপায় মারা যায়।
    জেলা প্রশাসন থেকে শহরসহ জেলায় মোট ৩৫ জনের নিহতের তালিকা পাওয়া গেছে বলে জানান, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর তাপস দাশ। বিশেযজ্ঞরা জানান, পাহাড়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ করে বসাবাস করায় পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। রাঙামাটি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, শহরসহ রাঙ্গামাটির আশেপাশে বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বসবাস করায় পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। প্রতিরোধে পরবর্তী পদরেক্ষপ নেয়া হবে।
    এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। এজন্য শহরসহ বিভিন্ন স্থানে ১৬ আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
    হতাহতদের দেখতে হাসপাতালে গেছেন, রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নানসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। দুর্যোগ মোকাবেলায় মঙ্গলবার বিকালে জরুরি সভা করেছে জেলা প্রশাসন।
    এদিকে সড়কের ওপর পাহাড় ধ্বসে মাটি পড়ায় রাঙামাটি-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে রাঙামাটির ওইসব রুটে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া তার ছিঁড়ে ও হাম্বা উপড়ে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে অন্ধকারে ভুতুরে শহরে পরিণত হয়েছে গোটা রাঙামাটি শহর ও আশেপাশের এলাকা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here