ব্যক্তিগত বিদ্বেষের শিকার বাবুল চমেকে অহরহ নাজেহাল হচ্ছেন রোগী ও স্বজন

    0
    1

    চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ইন্টার্নি চিকিৎসকের হাতে প্রতিনিয়ত নাজেহালের শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। এতে বাদ যাচ্ছেন না জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ।
    ভুক্তভোগীরা জানান, হাসপাতালে বেশিরভাগ চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় ও কর্মচারী চিকিৎসাসেবা দিতে নিবেদিত থাকেন। কিন্তু গুটিকয়েক চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, কর্মচারী ও আয়া রোগী ও তাদের স্বজনদের নাজেহাল করে থাকেন। তাদের কারণে ভাল কাজগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে প্রতিনিয়ত রোগী ও স্বজনরা নাজেহালের শিকার হন। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে অনেকটা অসহায় রোগী ও স্বজন। প্রতিকার তো দূরের কথা, উল্টো হয়রানি শিকারের আশঙ্কায় কারো কাছে অভিযোগও করেন না তারা ।
    চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি চমেক হাসপাতালে অবরুদ্ধ হন ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ-পরিচালক আবদুস ছাত্তার ম-ল। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ধাক্কায় আহত এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে চিকিৎসা করতে এসে তিনি হাসপাতালের দালাল ও তৃতীয় শ্রেণির কতিপয় কর্মচারীর দ্বারায় এই পরিস্থিতির শিকার হন। তাদের দাবি অনুযায়ী ৬০০ টাকার অষুধ ৪১০০ টাকা পরিশোধ না করায় তাকে হাসপাতালে অবরুদ্ধ করেন তৃতীয় শ্রেণির কতিপয় কর্মচারী। পরে তিনি পুলিশের সাহায্য নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন।
    সর্বশেষ গত ২৪ জুন বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়ে ইন্টার্নি চিকিৎসকদের হাতে নাজেহালের শিকার হন রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল। এরপর তাঁকে আটকে রেখে জোরপূর্বক মুচলেকা নেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। কিন্তু এ ধরনের ঘটনার নেপথ্য কথন এবং যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটি ছিল বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার এক চিকিৎসক নেতার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিদ্বেষ-প্রসূত ঘটনা। তিনি পুরো ঘটনাটি ‘তিল থেকে তালে’ পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

    অভিযোগ ওঠেছে, ‘২৪ জুন চমেক হাসপাতালে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা এক বিএমএ নেতার পরিকল্পনা অনুসারে রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুলের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছেন। মুচলেকায় ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওই বিএমএ নেতা চানক্যতার পরিচয় দেন। মুচলেকায় এক নারী চিকিৎসককে শারীরিক হেনস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি ২৪ জুনের ঘটনা সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত অংশটি গত শনিবার সিটি মেয়রের কার্যালয়ে বৈঠকে প্রদর্শন করা হলে সেখানেও শারীরিক হেনস্থার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

    অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ জুন দুপুরে রাউজানে সড়ক দুর্ঘটনায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুলের দুই আত্মীয় গুরুতর আহত হন। আহতদের প্রথমে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের চমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। ওইদিন বিকেল ৪টায় তাদের চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়াল্টি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে ওই রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখার অভিযোগ পেয়ে চেয়ারম্যান বাবুল ৬টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। এ সময় ওই ওয়ার্ডে কর্মরত ছিলেন এক নারী ইন্টার্নি চিকিৎসক। আত্মীয়ের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি তাঁর সাথে কথা বলেন এবং ডিউটিতে অন্য চিকিৎসক আছেন কিনা জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে অন্য চিকিৎসকদের না পেয়ে হাসপাতালের পরিচালকের মোবাইলে তিনি ফোন করেন এবং আত্মীয়দের চিকিৎসার সহযোগিতা কামনা করেন। এরপর সাড়ে ৬টার দিকে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ইফতারের পর আত্মীয়দের দেখতে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি পুনরায় হাসপাতালে আসেন। এ সময় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা পরিচালককে কেন ফোন করেছেন তা জানতে চান। এক পর্যায়ে তারা জড়ো হয়ে ওয়ার্ডের গেট বন্ধ করে তাঁকে আটকে রাখে এবং জোরপূর্বক মুচলেকা নেন।’

    এদিকে, এ ঘটনার জের ধরে পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনার ৮ দিনের মাথায় গত শনিবার বিকেলে আবারো সমঝোতা বৈঠক হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মধ্যস্থতায় বৈঠকে বিএমএ ও ইন্টার্নি ডক্টরস এসোসিয়েশনের (আইডিএ) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ২৪ জুন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় যে প্রচার-প্রচারণা হয়েছে যে, তার সাথে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা কোনভাবে সম্পৃক্ত নয় বলে জানানো হয়। এতে উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুলের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানহানি ঘটে থাকলে তাতে সকলে সমভাবে ব্যথিত বলে উল্লেখ করে উভয়পক্ষ একটি কাগজে সমঝোতা স্বাক্ষর করেন। জনমনে প্রশ্ন এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল যদি অপরাধী হয়ে মুচলেকা দিয়ে থাকেন তাহলে সমঝোতার প্রশ্ন আসে কি করে। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তিনি নাজেহালের শিকার হয়েছেন বলেই এই সমঝোতা নয় কি ?

    জানতে চাইলে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ও রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ জুন ভুল বুঝাবুঝির কারণে কিছু সমস্যা হয়েছে। এ নিয়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সাহেব উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। মেয়রের মধ্যস্থতায় নগর ভবন কার্যালয়ে গত পহেলা জুলাই একটি সমঝোতা হয়। ওই বৈঠকে আমি সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। কারণ আমার ছেলে-মেয়ের বয়সী কেউ না বুঝে ভুল করে থাকলে অভিভাবক হিসেবে তাদের তো মাফ দিতে হয়।’
    চমেক হাসপাতালে ইন্টার্নি চিকিৎসকের হাতে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল হওয়ার প্রসঙ্গে ইন্টার্নি ডক্টরস এসোসিয়েশনের (আইডিএ) আহ্বায়ক ডা. রিয়াজ উদ্দিন মিতুল দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হাসপাতালে একজন রোগীর সাথে একজন করে এটেনডেন্স থাকার নিয়ম থাকলেও সেখানে কয়েকজন করে এটেনডেন্স চলে আসে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ নিয়ে চিকিৎসকের সাথে প্রায়শঃ ঝামেলা সৃষ্টি করে রোগী ও স্বজনরা।’
    রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণ এবং মেয়রের কার্যালয়ে পুনরায় সমঝোতার প্রসঙ্গে ডা. রিয়াজ উদ্দিন মিতুল বলেন, ‘২৪ জুনের পর চেয়ারম্যান বাবুল সাহেবের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রিকায় যে অপ্রচার হয়, তার সাথে আমরা সম্পৃক্ত নই। মূলত ওই বৈঠকে আমরা এ বিষয়টি তুলে ধরেছি।’

    বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে সিটের তুলনায় দ্বিগুনের বেশি রোগী থাকে। তাদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের রীতিমত হিমশিম খেতে হয়। এরপরও যদি রোগী ও স্বজনদের সাথে কোনো চিকিৎসকের খারাপ আচরণের সুনিদির্ষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

    রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে মুচলেকা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওইদিন আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ায় ছিলাম। আমি থাকলে ঘটনা এটুকু গড়াতো না। গত শনিবার এ নিয়ে মেয়র মহোদয়ের কার্যালয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে একটি বৈঠক করেছি। ঘটনার একটা সুষ্ঠু সমাধান করা হয়েছে। আশা করি এ নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির অবসান হয়েছে।’
    চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. জালাল উদ্দিন দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নার্সসহ যে কারো বিরুদ্ধে সুনিদির্ষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

    এদিকে, সাদা কাগজে জোরপূর্বক মুচলেকা নেওয়ার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘আদালতে কেউ মুচলেকা দিলে সেটির আইনগত ভিত্তি থাকে। কিন্তু সাদা কাগজে কিংবা জোরপূর্বক মুচলেকার আইনগত কোনো ভিত্তি থাকে না। তবে তা রেফারেন্স হিসেবে ধরা যেতে পারে।’

    (সুত্র : দৈনিক পূর্বকোণ )

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here