গোলাপী রাউজানে সবুজের বিপ্লব

    0
    8

    গাজী জয়নাল আবেদীন,
    ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাস্টার দা সূর্যসেনের জন্মভুমি রাউজানের সকল সরকারী-বেসরকারী কার্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি সড়কের দুই প্রান্তের দোকানপাট সহ নানা স্থাপনা গোলাপী রঙে সজ্জিত। এজন্যে এই উপজেলাকে বলা হয় গোলাপী রাউজান। এবার এই গোলাপী রাউজানে শুরু হয়েছে সবুজের বিপ্লব। গতকাল ২৫ জুলাই উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভায় সকাল ১১ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এক ঘন্টায় এক যোগে সাড়ে চার লক্ষ ফলদ বৃক্ষের চারা রোপন করে বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করেছে রাউজান।
    জানা যায়, উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের মহাসড়ক ও অভ্যন্তরিণ সড়কের দুপাশে, মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে, ইউনিয়ন পরিষদের পাশে, পুকুর পাড়সহ সবখানে লাগানো হয় ২২ প্রজাতির ফলদ গাছের চারা। উপজেলাকে গ্রীণ সিটিতে রূপান্তর ও দেশীয় ফলের চাহিদা মেটাতে এ উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিগত চার মাস ধরে মাইকিং, পোস্টার, সংবাদ সম্মেলন ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আলোচনা সভা সহ নানা প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে এই কার্যক্রমকে বাস্তবরূপ দেন।
    সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯ টা থেকে বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন গুলোর কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীবৃন্দ, মসজিদ ইমাম, মন্দিরের পুরুহিত, প্যাগোডার ভিক্ষু সহ সর্বস্তরের জনসাধারণ স্বতঃফুর্তভাবে উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে স্ব স্ব ইউনিয়নে, প্রতিষ্ঠানে ফলদ বৃক্ষের চারা নিয়ে সমবেত হতে থাকেন। ঘড়ি কাটা ১১ টার ঘরে গেলেই শুরু সবুজ বিপ্লবের মহাযজ্ঞ। প্রায় আশি হাজার সবুজ বিপ্লবী ১৫৩ টি দলে বিভক্ত হয়ে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এই বৃক্ষরোপন অভিযানে অংশ নেয়। এই সময় উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ১৫টি মনিটরিং টিম এই বৃক্ষরোপন অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন এবং ছবি সংগ্রহ করেন।
    উপজেলা প্রশাসনের সূত্রে জানা যায় রোপন করা মোট চারা পরিমাণ ৪ লক্ষ ৫০ হাজার। তৎমধ্যে আম ১ লাখ ৫ হাজার, কাঁঠাল ৬৫ হাজার, জাম ২৩ হাজার ৫শ, জলপাই ২৬ হাজার, বেল ১৫ হাজার, আমলকি ৩১ হাজার, লিচু ৯ হাজার, মালটা ২ হাজার, খেঁজুর ২ হাজার ১শ, ডালিম ৯ হাজার, সফেদা ১০ হাজার, আমড়া ২০ হাজার, লেবু ১০ হাজার, বাতাবি লেবু ১০ হাজার, মিষ্টি তেতুল ৮ হাজার, কমলা ১০ হাজার, আতা ৫ হাজার, কাট বাদাম ৩শ, কামরাঙ্গা ২০ হাজার, বাকী ২০ অন্যান্য জাতের। এগুলো উন্নতজাতের চারা। এসব ফলজ চারার কিছু কিছু আগামীবছর, কিছু ২-৭ বছরের মধ্যে ফল দিবে বলে জানান কৃষি অফিসার বেলায়েত হোসেন। এসব ফলদ বৃক্ষের চারা গুলো বান্দরবন, লামা, হাটহাজারী, কাউখালী, এলাকার তিনটি সরকারী, ৩টি বেসরকারী নার্সারী সংগ্রহ করা হয়েছে।
    উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন শেষে বেলা ২ টায় উপজেলা কনফারেন্স হলে স্থানীয় গনমাধ্যম কর্মীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মলনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। আমি রাউজানের ইউএনও হতে পেরে বেশ গর্ববোধ করছি। বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র রাউজান উপজেলা একঘন্টার মধ্যে একযোগে সাড়ে চার লক্ষ শুধু ফলদ চারা রোপন করে বিশ্বের বুকে নজির স্থাপন করেছ্ ে
    এটি গিনিজ বুকে রেকর্ড স্থাপন হতে যাচ্ছে । তাদের শর্তানুযায়ী আমরা সকল কাজ সম্পন্ন করেছি। গিনিজ বুক কতৃপক্ষের নিকট প্রেরণের জন্য প্রায় একহাজারেরও অধিক স্পটের ছবি ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, ’তোমার গাছটি কেমন আছে” নামক প্রোগ্রামের মাধ্যমে আগামী দুইবছর রোপণকৃত চারা গুলো পর্যবেক্ষন ও পরিচর্যা করা হবে। উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগীতায় ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলো গাছের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকবেন। যেসব এলাকায় যারা চারা লাগাবেন তাদের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও চেয়ারম্যান, মেম্বারগণ সেসব চারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। বছরশেষে অধিক চারা অক্ষত রাখতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিকে উপজেলা পরিষদ থেকে এ্যাওয়ার্ড দেয়া হবে। ৭০ শতাংশের কম চারা সংরক্ষণে অক্ষম তথা ব্যর্থ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ তিনি আরো জানান, এই কর্যক্রমে প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই খরচের বড় অংশ বহন করেছেন স্থানীয় সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী । বাকী গুলো স্থানীয় সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধিরা বহন করেছেন।
    গিনিজ বুকের ওয়েব সাইড সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার তুবানে এক ঘন্টায় ২ লক্ষ ৩২ হাজার ৬শ ৪৭ টি গাছের চারা রোপন লিপিবব্ধ হয়েছিল গিনিজ বুকে। ২০১৫ সালের ২ জুন ভুটানের থিম্পুতে এক ঘন্টায় ৪৯ হাজার ৬ শ ৭২ টি গাছের চারা লাগানোর রেকর্ড রয়েছে। এছাড়াও গত বছর বাংলাদেশের রংপুরের তারাগঞ্জে ২লক্ষ ৫০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির চারা রোপন করেছিল তা এখনও গিনিজ বুকে স্থান পায় নি। রাউজানে একঘন্টায় শুধু মাত্র ফলদ গাছের চারা রোপন করা হয়েছে সাড়ে চার লক্ষ। এবং এই কার্যক্রম গিনিজ বুকে স্থান করে নেওয়ার জন্য গিনিজ বুক কতৃপক্ষের সকল শর্ত ও নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here