বাল্যবন্ধুর হাতে খুন হওয়া রাউজানের ইমরানুল পরিবার খুনির ফাসির চান

    0
    3

    অনিক সিদ্দিকী, রাউজাটাইমস :-

    আমার ছেলেকে এনে দাও। আমার শান্ত ভদ্র ছেলেটা গত ঈদে বাড়ী ছিল। আর এবারে আসল না কেন? আমাদের তো ঈদ বলতে কিছুই ভাল লাগছে না। অমিত্তে (অমিত মুহুরী) আমার ছেলেকে খুন করেছে। আমি তার বিচার চাই। তার ফাসি চাই।  নিজ বাড়ীর একটি কক্ষে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিলাপ করতে করতে কথা গুলো বলছিলেন বাল্যবন্ধুর হাতে নির্মমভাবে নিহত চট্টগ্রামের রাউজানের ছেলে এমরানুল করিম ওরফে ইমনের মা এরশাদ আরা বেগম। ছেলে হারানোর শোকে কাতর হয়ে পড়া এরশাদ আরা বেগমের হাতে তখন চলছিল স্যালাইন। ঈদের আগেরদিন ছেলের নির্মম মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন।
    পৌর সভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লুধি চৌধুরী বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায় এমন করুণ দৃশ্য। বাবা রেজাউল করিম গত ৫ মাস আগে স্ট্রোক করে আগে থেকেই অসুস্থ। তার মাঝে বড় ছেলের এমন মৃত্যুর খবর জেনে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন আর জ্ঞান ফিরে হাওমাউ করে কাদছিলেন।

    পরিবারের সদস্য ও এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, খুন হওয়া ইমরানুল ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের অস্বচ্ছলাতার কারনে গত এক বছর আগে গহিরা কলেজে এইচএসসি পড়ালেখাকালীনই চাকরী যোগ দেয় কক্সবাজারে। সেখানে মোবাইল অপারেটিং এর কাজ করত। গ্রামে থাকাকালীন তিনি রাউজান পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে জানান স্থানীয় ছাত্রলীগকর্মীরা।
    তার চাচা মো. হারুনুর রশিদ বলেন গত ৮ আগস্ট নতুন চাকরি খোঁজার জন্য গ্রামের বাড়ী থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় অবস্থিত তার খালার বাসায় যায় ইমরানুল। ৯ তারিখ ইমরানুলকে ফোনে ডেকে নিয়ে যায় তার বাল্যকালের বন্ধু ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী। এরপর ১০ আগস্ট তারিখ থেকে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইল বন্ধ থাকায় তার কোন খবর না পাওয়ায় তার ছোট ভাই ইরফানুল করিম ২২ আগস্ট রাউজান থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি (ডায়েরী নং-৭৩৬) করেন।
    ইমরানুলের বাবা রেজাউল করিম বলেন, সর্বশেষ গত ৯ আগস্ট তার মার সঙ্গে ফোনে কথা বলে। তখন বাড়ী থাকা একটি ছাগল বিক্রীর বিষয় নিয়ে তার ছোট ভাই রিমনের সঙ্গে কথা বলে। তখন সে অমিত মুহুরীর সঙ্গেই আছে বলে জানান। ইমরানুল আর অমিত মুহুরি বাল্যকালের বন্ধু। এমনকি তারা গ্রামে সানসাইন ও সুরেশ বিদ্যালয়তনে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে। অমিত মুহুরি ছোটকালে আমাদের বাসায় প্রায় সময় আসত। তিনি বলেন আমার মৃত্যুর পর যে ছেলে মাটি দিবে সেই ছেলে অমিত খুন করে ফললো বলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বলেন অমিতের বিচার চাই। তার ফাসি না হলে আমরা শান্তি পাবো না।
    পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ১৩ আগস্ট দুপুরে এনায়েত বাজার মোড়ের রানীর দিঘীতে ভাসতে থাকা একটি ড্রাম উদ্ধার করে পুলিশ। অর্ধেক কাটা ড্রামটি সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা ছিল। পরে ঢালাই কেটে একটি গলিত লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেফতারের পর তারা জানায় লাশটি চট্টগ্রামের রাউজানের পৌর সভার ৯নং ওয়ার্ডের লুধি চৌধুরী বাড়ীর রেজাউল করিম ছেলে ইমরানুল করিমের। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট উপজেলার শ্রীরামপুর এলাকার হুমায়ুন কবির মজুমদারের ছেলে মো. ইমাম হোসেন মজুমদার ওরফে শিশির (২৭) ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের ভোরবাজার এলাকার মৃত আশরাফ মিয়ার ছেলে মো. শফিকুর রহমান ওরফে শফি (৪৬)। পরে কুমিল্লার মাদতাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে অমিত মুহুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্য মতে, ইমরানুলের সঙ্গে অমিত মুহুরীর পূর্ব বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ইমরানুলকে নন্দনকাননের নিজের বাসায় ডেকে নেয় অমিত মুহুরী। এরপর গ্রেফতারকৃত দুইজনের সহায়তায় ইমরানুলকে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তারা। ৯ আগস্ট ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে লাশ গুম ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একটি অর্ধ কাটা ড্রামে ইমনের লাশ ভরে চুন ও এসিড ঢেলে ড্রামের উপরে সিমেন্ট বালু দিয়ে ঢালাই করে দেয়। এরপর সেটি বাসার মধ্যে রেখে দেয় এবং পরবর্তীতে ভ্যান গাড়ী যোগে ১২ আগস্ট গভীর রাতে রানীর দিঘীর পাড়ে ড্রামে ভর্তি অবস্থায় লাশ ফেলে দেয়া হয়।
    রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ কেফায়েত উল্লাহ্ বলেন, খুন হওয়া ইমনের নামে থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরী করা হয়েছিল। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। তবে খোঁজ পায়নি।
    রাউজান উপজেলার পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের লুধু চৌধুরী বাড়ির রেজাউল করিমের বড় ছেলে ইমরানুল করিম ইমনকে (২৫) গত ৯ আগস্ট নগরীর নন্দনকাননে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। তাকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী একই ওয়ার্ডের ডাঃ মনোরঞ্জন মুহুরির বাড়ির অরুণ মুহুরির (প্রকাশ-পুয়ুন) বড় ছেলে অমিত মুহুরি। যার নামে নগরীর কোতোয়ালী থানায় একডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। এমনি কি ইমরানুলকে হত্যা করার দুই দিন আগে সে সিআরবির জোড়া খুনের মামলায় জামিন পায়। জামিনে মুক্তি পেয়েই সে ইমনকে হত্যা করে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here