‘অল রাউন্ডার’ নওশিনে মুগ্ধ সবাই

    0
    3

    জাহেদুল আলম :
    বাবা একসময় বাসের সহকারী ছিলেন। এখন কারচালক। যা উপার্জন করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। সংসারের খরচ জোগাতে মা করেন টিউশনি। তাঁদের এ দুঃখের সংসারে একটি ‘আলো’ আছে। তাঁদের কন্যাসন্তান। নাম নওশিন শরমিলি। রাউজান মোহাম্মদপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী সে। মেধাবী ছাত্রীটি শিশু বয়সেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে সবাইকে মুগ্ধ করছে। সে এ বছর উপজেলার ৭০টি স্কুলের প্রতিযোগীদের মধ্যে মেধা প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছে। স্কুলের পরীক্ষা ও নানা সংগঠনের বিভিন্ন মেধাবিকাশ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেরার স্থানটি দখল করেছে। পাশাপাশি সমানতালে সংগীত, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতাতেও রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। বাংলা, ইংরেজিতে উপস্থিত বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গানসহ নানা প্রতিযোগিতায় খুবই পারদর্শী নওশিন। ২০১৫ সালে উপজেলাভিত্তিক সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্যে রাউজানের শ্রেষ্ঠ হয়েছে সে। নওশিনের এমন কৃতিত্বে উত্ফুল্ল ও উজ্জীবিত তার পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক ও এলাকাবাসী। তাঁরা এ মেয়েকে নিয়ে দেখছেন বর্ণিল স্বপ্ন। বাবা-মায়ের চাওয়া সুশিক্ষিত হয়ে মেয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। নওশিনের বাড়ি রাউজানের বিনাজুরি ইউনিয়নের লেলেংগারায়। বাবার নাম আবু মুছা। মা লাকি আকতার। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট নওশিন। আবু মুছা জানান, চলতি বছর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের মেধা প্রতিযোগিতায় হাইস্কুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছে নওশিন। এ প্রতিযোগিতায় উপজেলার ৭০টি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাছাইকৃত ৭০ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম হোসেন রেজা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাসহ সংশ্লিষ্টজনেরা মেধা পরীক্ষা শেষে নওশিনকে ‘শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থী’ হিসেবে ঘোষণা দেন। জানা গেছে, প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাউজান কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘এ গ্রেডে’ বৃত্তি পায় নওশিন। সেখান থেকে তার শুরু। পেছনে আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। চতুর্থ শ্রেণিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি আয়োজিত শিশু মেধা বিকাশ বৃত্তি পরীক্ষায় পায় ট্যালেন্টপুল বৃত্তি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফল করে। পেয়েছে জিপিএ-৫সহ টেলেন্টপুল বৃত্তি। পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির শিশু মেধা বিকাশ বৃত্তি পরীক্ষায় পায় ট্যালেন্টপুল বৃত্তি। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যক্ষ আল্লামা হাফিজুর রহমান (র.) এডুকেশন ফাউন্ডেশন বৃত্তি পরীক্ষায় পেয়েছে বৃত্তি। ৭ম শ্রেণিতেও একই বৃত্তি পায়। ২০১৫ সালে ৮ম শ্রেণিতে রাউজান উপজেলাভিত্তিক সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্যে পুরো উপজেলার মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করে নওশিন। ৮ম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাসসহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। ১০ম শ্রেণিতেও উপজেলাভিত্তিক সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় রাউজানের শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয় সে। ২০১৫ সালে ৮ম শ্রেণিতে শহীদ হালিম-লিয়াকত স্মৃতিবৃত্তি পরীক্ষায় পায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি।
    সংগীতেও পিছিয়ে নেই নওশিন। ১০ম শ্রেণিতে উচ্চাঙ্গ সংগীতে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে ২০১৫ সালে। বিতর্কেও দক্ষ সে। কয়েকমাস আগে সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান আয়োজিত ৭০ স্কুলের অংশগ্রহণে উপজেলাভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতার ২য় রাউন্ডে সেরা বিতার্কিকের স্বীকৃতি লাভ করে সে। ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে নওশিন। জানালো, স্কুল জীবনে এত কিছুু অর্জনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন মা লাকি আকতার আর বাবা আবু মুছা। শিক্ষকদের কাছেও সে কৃতজ্ঞ।
    বাবা আবু মুছা বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে শখ আর স্বপ্ন ছিল, ছেলেমেয়েরা যতটুকু পড়তে পারে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাব। তাদের মেধাবী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করব। মেয়ের সাফল্যে আমি মুগ্ধ। এত কিছু সব তাদের মায়ের অবদান। ছোট মেয়ে নওশিন বিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও সে সব বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখে। আমার স্বপ্ন, মেয়েরা লেখাপড়া করে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবে। কারো মুখাপেক্ষী হবে না। বড় হয়ে মানবসেবা করবে। দেশের কল্যাণে কাজ করবে। ’
    তিনি জানান, তাঁর তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাই কমবেশি মেধাবী। নওশিনের বড় বোন শারমিন আকতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফলিত রসায়ন বিভাগের শেষবর্ষের ছাত্রী। বড়ভাই চট্টগ্রাম মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে এবার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ বিভাগে পড়াশোনার জন্য বাছাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে। আবু মুছা বলেন, ‘সংসারে বড়োই অভাব। গাড়ির হেলপারি করে যা পেতাম, তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। কষ্টের মধ্যে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে নিয়েছি। পরে বাস চালিয়েছি। এখন কার চালাই। এখনো যা উপার্জন করি, তার সব সংসারে খরচ হয়ে যায়। হাতে অবশিষ্ট কোনো টাকা রাখতে পারি না। সংসারের খরচে সাপোর্ট দিতে সন্তানের মাও গত ১০ বছর ধরে প্রাইভেট টিউশনি করে। ’
    উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘নওশিনের মতো মেধাবীরা রাউজানের গর্ব। এ উপজেলায় অনেক মেধাবী আছে, তাদের একটু সমর্থন দিলে তারা সারাদেশে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হবে। ’
    উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটা পড়ালেখায় খুব ভালো। ইংরেজি, বাংলা, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, উচ্চাঙ্গ সংগীত, উপস্থিত বাংলা-ইংরেজি বক্তৃতা দেওয়াসহ যেকোনো প্রতিযোগিতায় নওশিনের দক্ষতা অতুলনীয়। মেয়ের লেখাপড়ার প্রতি তার বাবা যেভাবে উৎসাহ দিচ্ছেন, তাতে আমি অভিভূত। ’
    স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘নওশিনের মতো শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়কে আলোকিত করে আছে। তার লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ অত্যন্ত সুদৃঢ়। তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। ’

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here