কাপ্তাই সড়কের বেহাল দশা ; জনদূর্ভোগ চরমে

    0
    8

    গাজী জয়নাল আবেদীন :
    অধিক জনগুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার’ প্রকল্পের পাইপলাইন সংস্থাপানের জন্য অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি, কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলা জনিত কারণে সৃষ্টি হয়েছে বেহাল দশা। এই সড়ক দিয়ে যাতায়তকারী রাঙ্গুনিয়া, রাউজান,হাটহাজারী,পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাই সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগ করছেন নরকীয় যন্ত্রণা। অগণিত খানাখন্দকে বিধ্বস্ত সড়কটি যেন চলাচলকারী যাত্রীদের মৃত্যু ফাঁদ। এছাড়াও দিনের বেলায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, সড়কের মাটি বিক্রির জন্য রাস্তার মাঝে ট্রাক দাঁড় করিয়ে মাটি লোড করা ও ওয়াসার অদক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে যানজটের সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। নিত্যদিন অপচয় হচ্ছে সময়ের, নষ্ট হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, দূর্ঘটনার মিছিলে যোগ হচ্ছে ছোট বড় মর্মান্তিক ঘটনা।
    সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন থেকে মোহরা রাস্তার মাথা পর্যন্ত প্রায় ২৬ কিলোমিটার সড়ক জুঁড়ে অগণিত গর্ত। কোথাও বিটুমিন ঊঠে গিয়ে কাদাজলে পরিপূর্ণ ডোবা সদৃশ বিশাল গর্ত। মোহরা রাস্তার মাথা থেকে মদুনাঘাট ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৫ কিমি সড়কে ৯০ শতাংশে নেই বিটুমিনের অস্থিত্ব। সহস্রাধিক গর্তে বিধস্ত প্রায় সড়কটি মনে হয় পাহাড়ি দূর্গম বন্ধুর পথ। মদুনাঘাট হতে রাউজান অংশের জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান নোয়াপাড়া কলেজ গেইট থেকে পল্লী বিদ্যুৎ -২ কার্যালয়, মোতালেবের টেক হতে কালু মরার টেক, গশ্চি নয়াহাট, দমদমা, রাউজান পিংক সিটি-২ এর পূবাংশ থেকে চুয়েট হয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত, রাঙ্গুনিয়ার অংশে সেলিনা কাদের কলেজ, বুড়ির দোকান থেকে শান্তির হাট বাজার হয়ে বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়, গোছরা চৌহমুনি, ইছাখালি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পূর্বদিক পর্যন্ত ছোট বড় সহস্্রাধিক গর্তে সড়কটির বেহাল দশা। সড়কের যে অংশটুকু পাইপলাইন সংস্থাপনের খোঁড়া হয় তা দায়সারাভাবে ইট সলিং দেওয়া হলেও কাজ করার সময় সড়কের বাকী অংশে সলিং উঠে গিয়ে গর্ত সৃষ্টি হলে তা মেরামত করা হয়না। অনেক স্থানে ইট সলিং তা সুচারুরূপে না হওয়ায় গর্তেও সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে নিত্যদিন কোথাওনা কোথাও ঘটছে দূর্ঘটনা। অপরিকল্পিত ভাবে দিনে এবং রাতের অগ্রভাগের ব্যস্ত সময় খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়াও গাড়ি চলাচলের সংকোচিত পথটিতে সড়কের মাটি বিক্রির জন্য ট্রাক দাঁড় করিয়ে মাটি ভর্তি করার কারণে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। এছাড়া সড়কের বেহাল দশার কারণে গাড়ির গতি ঘন্টায় ৭/৮ কিমির বেশী হয় না। ২০ মিনিটের পথ এক ঘন্টায়ও শেষ হয় না। যানজট ও রাস্তার বেহাল দশার অজুহাতে চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দাবী করে। বিগত পাঁচ বছর যাবৎ ওয়াসার পাইপলাইন সংস্থাপন কাপ্তাই সড়কে যাতায়তকারীদের দুঃখে পরিণত হয়েছে।

    নিয়মিত যাতায়তকারী বাগোয়ানের গরীবুল্লা পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা লাকী বিশ্বাস বলে, এটাকে রাস্তা বললে ভুল হবে। পুকুর সম বড় গর্ত আর উঁচুনিচু টিলা ডিঙ্গিয়ে আমার মত অসংখ্য যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যস্থলে গমন করেন। নিত্যদিন গাড়িতে ঝাঁকুনি খেয়ে স্কুলে এসে ক্লান্ত হয়ে যায়। তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, মনের অব্যক্ত প্রতিবাদ,হাজারো অভিযোগ যেনো ম্লান হয়ে যায় যথাযথ কতৃর্পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পেরে। আর প্রতিবাদ করেই বা কি হবে??
    নোয়াপাড়া সিএনজি চালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বলেন, রাস্তাটি গাড়ি চলাচলের কোন উপযোগী নয়। অন্যকোন পেশা জানা নেই বলে পেটের দায়ে গাড়ি চালায়। যেখানে আগে নোয়াপাড়া থেকে রাস্তার মাথা পর্যন্ত ৭-৮ বার আসা-যাওয়া করা যেত সেখানে একবার আসা-যাওয়ার পরে আর গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করে না। সমস্ত শরীর ব্যথা হয়ে যায়। প্রতিদিন গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এই বাড়তি খরচ মিটিয়ে রাতে বাড়ি যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে টাকা ধার করে চাল ডাল কিনতে হয়।গাড়ির মালিকরা আগে যেখানে গাড়ি মেরামতের জন্য মাসে ২-৩ হাজার টাকা ব্যয় করত তা এখন ৮-৯ হাজার টাকায়ও সমাধান হয়না।
    এই ব্যাপাওে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আহমেদ জানান, সড়কটি দায়ভার সম্পূর্ণ ওয়াসার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাদের কাজ সম্পূর্ণ হলে তারা সড়কটি কার্পেটিং করে দিবেন। তাদের অবহেলার কারণে জনগণ কষ্ট ভোগ করছেন।
    ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক ইয়াকুব সিরাজদৌল্লাহ জানান, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওয়াসার কাজ চলবে এর পর আমরা রাস্তাটি কাপেটিং করে দিব। দিনের বেলায় কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি জানান, কিছু কিছু জায়গায় জটিলতার কারণে দিনের বেলায় কাজ করতে হয়। আর আমাদের নিজস্ব ট্রাফিক ব্যবস্থা সর্বদা যানজট নিরসণে কাজ করছেন।
    উল্লেখ্য, হাটহাজারী ,রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণাংশ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চট্টগ্রাম শহরের সাথে যোগাযোগেরও একমাত্র পথ কাপ্তাই সড়ক। এছাড়া, কাপ্তাই, রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি জনগোষ্টীর চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়ক। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জীবতলী সেনাক্যাম্প, বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর শহীদ মোয়াজ্জম ঘাঁটি, বিজিবির কাপ্তাই ঘাঁটি, রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী জুট মিল, ফোরাত কার্পেট মিল, ইস্টার্ন ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, কোদালা চা বাগান, রাঙ্গুনিয়া শেখ রাসেল এভিয়ারি পার্ক, জুম রেস্তোরা ছাড়াও অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতের একমাত্র পথ এটি। যা ওয়াসার অপরিকল্পিত, অবহেলা ও কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে খানা খন্দকে বিধ্বস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here