বাবার স্মৃতি

    0
    3

    -: নিয়াজ মোরশেদ নিরু:-

    বাবা, তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকব? তুমি অন্ধকার কবরে কেমন আছ? তোমার চেহারাটা ভাসছে বার বার। তুমি মৃত্যুর ৩০ মিনিট আগেও আমাকে বলেছ তুমি বাচতে চাও। তখন তোমার প্রচন্দ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউতে অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর দিয়ে তুমি শ্বাস নিতে পারছ না। অনেক কষ্ট হচ্ছে তোমার। চোখে না দেখলে কেউ অনুমান করতে পারবে না, শ্বাস নিতে না পারার কষ্ট কি! তারপর ও আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমার দুই চোখ বেয়ে শুধু পানি পড়ছে।

    তা দেখে বাবা বলে যাচ্ছে ‘কাঁদিস না, সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকিস।’ এরপর সব থেমে গেল। তিনি চলে গেলেন আমাদের ফেলে। এখন আমি কি নিয়ে থাকব? কাকে সব কথা শেয়ার করব? কে আমাকে পরামর্শ দিবে? কে আমার জন্য চিন্তা করব? আমার বাবার মত মানুষ হয় না। তার সাথে কারো তুলনা নেই। মানুষকে ভালোবাসার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল। এত মেধাবী এত জ্ঞানী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। সব বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অত্যধিক। রুচি ছিল আধুনিক। নিজের পোশাক-আশাক ও খাওয়া-দাওয়া সব ছিল রুচিসম্মত। আমরা তার কোন গুন পায়নি। যারা একবার তার সাথে মিশেছেন তারা তাকে আপন করে নিয়েছেন। তার তুলনা কারো সাথে হবে না।

     

    মাত্র ৬৯ বছর বয়সে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা, বিনাজুরী নবীন স্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি, সমাজসেবক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ, কে জাফর খান গত ৫ অক্টোবর ২০১৭ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আর কখনো নিরু বলে ডাকবেন না। আমাদের বাসা ও নিজ বাড়ি (কাগতিয়া) সবখানে শূন্যতা বিরাজ করছে। এই শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা আমাদের বাবাকে পাব না। তিনি নেই, এটা মানতে পারিনা, পারছি না। আমার বাবা ছিলেন সকল কাজের প্রেরণা ও উৎসাহদাতা, আমার এই ছোট্ট জীবনে অনেক জ্ঞানী-গুণীর সাথে আমার মেশার সুযোগ হয়েছে। আর আমার বাবার মত প্রখর জ্ঞানী ও নিখাদ ভদ্রলোক আমি খুব কম দেখেছি। আমার বাবা বলে বলছি না। যারা আমার বাবার সাথে একবার মিশছে, তাদের মন আমার বাবা জয় করে নিয়েছে। আমার বাবা সব সময় গরীব, দুঃখি ও নির্যাতিত মানুষের কথা বলতেন এবং গোপনে তাদের সহায়তা করতেন। কোনদিন তিনি প্রচারে বিশ্বাসী ছিলেন না। সত্য কথা বলতেন স্পষ্টভাবে। সমালোচনা করতেন সামনে, কোন কিছুকে ভয় করতেন না। এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে আমার আব্বার অবদানের কথা আপনারা সবাই জানেন। তিনি গর্ববোধ করে বলতেন, আমি শিক্ষক পিতার সন্তান। আমি মাথা উচু করে কথা বলব। আমাদের সব সময় কোন কিছুতে অতিরিক্ত বা লোক দেখানো কাজ করতে নিষেধ করতেন। বলতেন মধ্যপন্থা নীতি অনুসরণ কর। জীবনে কষ্ট পাবে না। সব কিছুতে তার উৎসাহ ছিল অনেক। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, রেসলিং রাতজেগে তিনি খেলা দেখতেন। বিশ্বকাপ ফুটবলে তিনি আর্জেন্টিনা, ক্রিকেটে বাংলাদেশের পর ভারত, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড, উয়েফা চ্যাম্পিয়নলীগে বার্সেলোনা’র কড়া সমর্থক ছিলেন।

    গুন গুন করে শুনতেন রবীন্দ্র সংগীত, খুব পছন্দ ছিল রবীন্দ্রসংগীত। বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তার ছিল গভীর জ্ঞান। উপমহাদেশের ক্ষমতা পট পরিবর্তনের ইতিহাস আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি, তিনি নিখুত ও সুন্দরভাবে বলতেন। আমরা মনমুগ্ধকর হয়ে শুনতাম। তিনি বিভিন্ন মনীষী ব্যক্তির জীবনী নিয়ে বলতেন। তার স্মরণ শক্তি ছিল প্রখর। আমাদের গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের কার কয়টি সন্তান, তারা কি করে, কার বিয়ে কোথায় হয়েছে, সব ছিল তার মুখস্ত। আমার খুব আশ্চর্য লাগে কিভাবে তিনি এত কিছু মনে রাখতেন। বাবা ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের আপাদমস্তক কড়া সমর্থক। রাউজান কলেজ, সরকারী সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় স্বাধীনতার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিকভাবে আমার বাবার তেমন মূল্যায়ন হয়নি। এই নিয়ে তার মনে চাপা ক্ষোভ ছিল। তার পোশাক আশাক, খাওয়া- দাওয়া সব কিছু ছিল রুচিসম্মত। তিনি তার মত করে ব্র্যান্ডের দোকান থেকে কোর্ট, শার্ট, প্যান্ট সেলাই করে নিতেন। পছন্দ করত রাড়ু (RARU) ঘড়ি। জুতো পরতেন চামড়ার, সব সময় পরিপাটি করে চলতেন। সাধারণ মানুষের কথা বেশি করে ভাবতেন। আমাদের সাথে আলাপে বলতেন, আমাদের বাড়ি বা পাড়ার ঐ লোক অসুখে কষ্ট পাচ্ছে, ঐ মহিলাটি বিধবা, ঐ লোকটা বৃদ্ধ দেখার কেউ নেই। এদের বেশি বেশি করে সাহায্য করতে হবে গোপনে। তিনি গোপনে খোজ খবর নিয়ে গোপনে সাহায্য পাঠাতেন। তাঁর বাঁচার খুব ইচ্ছা ছিল। মৃত্যুর ৩০ মিনিট আগেও বাঁচার আকুতি জানিয়েছে। কিন্তু বাঁচতে পারলেন না। এটাই নিয়তী ছিল, তখন তিনি নেই। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন যাতে তার আত্মা শান্তিতে থাকে। তার অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে আপনারা আমাকে সহায়তা করবেন। সংক্ষিপ্ত জীবনী: ১৯৪৮ সালে মরহুম এ. কে. জাফর খান চট্টগ্রাম রাউজান উপজেলার কাগতিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম সিরাজুল হক মাস্টার ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তার মা মরহুম আমেনা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। চার সন্তানের সংসারে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। তার বড় ভাইয়ের নাম মরহুম এ. কে. আহমেদ ছগির (সাবেক উপ পরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর), তার শৈশব কাল কেটেছে কাগতিয়া গ্রামে। প্রাইমারী স্কুলে তার লেখাপড়ার হাতেঘড়ি। বিনাজুরী নবীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। রাউজান কলেজ থেকে এইচ.এস.সি এবং সরকারী সিটি কলেজ থেকে বি.কম পাশ করেন ১৯৭২ সালে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন।

     

    ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। চাকরীতে যোগদানের পর একই গ্রামের মরহুম তৈয়মুল হক ও মাহফুজা খাতুনের বড় কন্যা সেলিনা আক্তার এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তিনি ২ সন্তান ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। চাকরী জীবনে তিনি সৎ, দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটিসহ বিভিন্ন স্থানে চাকরী জীবনের সময় পার করেন। তিনি সর্বশেষ ২০০৮ সালে রাঙ্গামাটি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণ এর পর থেকে তিনি এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নেন। উত্তাল সময়ে স্বাধীনতার মহান আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি একজন সদালপি ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করেন। ২০১৬ সালে বিনাজুরী নবীন উচ্চ বিদ্যালয় এর গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হন। তার বড় ছেলে আরিফ মোরশেদ কর্ণফুলি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন এ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছে। তার মেঝ ছেলে নিয়াজ মোরশেদ নিরু প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তার কন্যা নাজমা বানু একজন গৃহিনী। মরহুম এ.কে. জাফর খান গত ৫ অক্টোবর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে রাউজানের নিজ বাড়ী মাতব্বর জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করা হয়।

    লেখক পরিচিতি:

    নিয়াজ মোরশেদ নিরু

    প্রবাসী কল্যান মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব, লেখক ও সংগঠক

     

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here