চোখের নীরব ঘাতক গ্লুকোমা

0
96

ডা. মো. সফিউল ইসলাম প্রধান :

গ্লুকোমা হলো বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের দ্বিতীয় কারণ। বাংলাদেশে শতকরা দু’জন লোক গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত। শতকরা ৫০ জন লোক জানেন না তার গ্লুকোমা রোগ আছে। বিরাট জনগোষ্ঠী গ্লুকোমা রোগের নামই শোনেননি। বেশিরভাগ গ্লুকোমা রোগী আসেন অন্ধত্বের কাছাকাছি সময়ে। তখন বেশি কিছু করার থাকে না। গ্লুকোমা এবং ছানির কারণে অন্ধত্বের মধ্যে পার্থক্য আছে। ছানির কারণে অন্ধত্বে অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টি ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু গ্লুকোমা রোগের কারণে অন্ধত্বে দৃষ্টি ফেরত পাওয়া যায় না। অফেরতযোগ্য অন্ধত্বের প্রধানতম কারণ গ্লুকোমা। উপসর্গ থাকে না বলে বেশিরভাগ গ্লুকোমা রোগীই বুঝতে পারেন না এর উপস্থিতি। তুষের আগুনের মতো ভেতরে ভেতরে নষ্ট করে দেয় স্নায়ুতন্ত্র।

১২ লাখ স্নায়ুতন্ত্র জালের মতো ছড়িয়ে থাকে চোখের সংবেদনশীল অংশ রেটিনাতে। সাধারণভাবে বলা যায়, চোখের চাপ বাড়ার কারণে অপটিক স্নায়ুতন্ত্র নষ্ট হতে থাকে। অবশ্য চাপ স্বাভাবিক অবস্থায়ও গ্লুকোমা রোগ হতে পারে। গ্লুকোমা রোগে কেন্দ্রীয় দৃষ্টি অনেক দিন পর্যন্ত ঠিক থাকে, কিন্তু পার্শ্বদৃষ্টি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। শেষের দিকে এসে এমন অবস্থা হয়, একটি নলের ভেতর দিয়ে দেখলে যে রকম দেখা যায়, ঠিক সে রকম দৃষ্টি হয়। একে বলা হয় টানেল ভিশন বা নলাকার দৃষ্টি। শেষের দিকে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিও ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ক্রমে বাতি নিভে যায়। পরিশেষে অফেরতযোগ্য অন্ধত্ব নেমে আসে।

গ্লুকোমা রোগ সাধারণত দুই চোখে একসঙ্গে হয়, তবে দৃষ্টির তারতম্য থাকতে পারে। অন্ধলোক পরিবারে এবং সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বয়স ৪০ হলে বছরে অন্তত একবার চোখের ডাক্তার দ্বারা চোখের ফান্ডাস দেখতে হবে এবং কোনো সন্দেহ হলে চোখের প্রেশারসহ অন্যান্য পরীক্ষা করাতে হবে। চোখের ডাক্তারদের দায়িত্ব হচ্ছে, প্রত্যেক রোগী দেখার সময় অবশ্যই চোখের ফান্ডাস দেখতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসার মাধ্যমে রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা যায়। ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ রোগীর মতো সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং নিয়মিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে গ্লুকোমা রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এতক্ষণ যে ধরনের গ্লুকোমার কথা বলা হলো, সেটা হলো প্রাইমারি ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা বা প্রাথমিক খোলা কোনো গ্লুকোমা। এ ছাড়া আরও কিছু ধরনের গ্লুকোমা আছে, যেমন- প্রাথমিক বন্ধ কোনো গ্লুকোমা, বাচ্চাদের গ্লুকোমা, সেকেন্ডারি বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে গ্লুকোমা। প্রাথমিক বন্ধ কোনো গ্লুকোমায় হঠাৎ করে এক চোখে ভীষণ ব্যথা হবে এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। পরে অন্য চোখও আক্রান্ত হবে।

সাধারণত ৪০ বছর বয়সের ওপরের নারীরাই এই রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগ সাধারণত অপারেশন অথবা লেজারের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে। বাচ্চাদের গ্লুকোমা রোগ হলে চোখ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে এবং চোখের মণি ঘোলা হয়ে যায়, পরিশেষে দৃষ্টি লোপ পায়। প্রথম অবস্থায়ই এই রোগ অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হয়। সেকেন্ডারি গ্লুকোমা সাধারণত চোখের অন্যান্য রোগের কারণে এবং আঘাতের কারণে হয়। সময়মতো অন্যান্য রোগ চিকিৎসার মাধ্যমে এ ধরনের গ্লুকোমা প্রতিরোধ করা যায়।

আরেক ধরনের গ্লুকোমা আছে, যা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় চোখের ওষুধ ব্যবহারের কারণে হয়। চোখের অ্যালার্জির কারণে অনেকেই স্টেরয়েড জাতীয় চোখের ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করেন। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চোখের প্রেশার বেড়ে যায় এবং অপটিক নার্ভ হেড শুকিয়ে যায়। পরিশেষে দুই চোখেই অন্ধত্ব নেমে আসে। কোনো ক্রমেই স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। গ্লুকোমা রোগ প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসার জন্য গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এই রোগ সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য গণমাধ্যমের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here